ইসলামি শরিয়ত অনুসারে, মাসিক (হায়েয) অবস্থায় নারীদের জন্য কিছু বিশেষ বিধান প্রযোজ্য। কোরআন ও হাদিসের আলোকে মাসিককালীন সময়ে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো নিম্নরূপ

0

  ইসলামি শরিয়ত অনুসারে, মাসিক (হায়েয) অবস্থায় নারীদের জন্য কিছু বিশেষ বিধান প্রযোজ্য। কোরআন ও হাদিসের আলোকে মাসিককালীন সময়ে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো নিম্নরূপ:

কোরআনের আয়াত ও সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি সহ 

মাসিক (হায়েয) সম্পর্কিত ইসলামি বিধান নিম্নে উপস্থাপন করা হল:

১. কোরআনের সরাসরি আয়াত (মূল দলিল):

সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২২:

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۖ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ

অনুবাদ: "তারা আপনাকে মাসিক (হায়েয) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এটা এক ধরনের অপবিত্রতা। তাই মাসিকের সময়ে তোমরা স্ত্রীদের থেকে পৃথক থাকবে এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তোমাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবে তাদের নিকট গমন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন পবিত্রতা অর্জনকারীদের।"

· ইঙ্গিত:

  ১. মাসিককে "أَذًى" (যন্ত্রণা/অসুবিধা) বলা হয়েছে।

  ২. এই সময় সহবাস (জিমা) নিষিদ্ধ।

  ৩. পবিত্রতা অর্জনের (يَطْهُرْنَ) পরই সহবাসের অনুমতি।

২. সহীহ হাদিসের বিস্তারিত বিধান:

ক) মাসিক অবস্থায় নামাজ ও রোজা:

সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩০৪, ৩২৫:

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي أَضْحًى أَوْ فِطْرٍ إِلَى الْمُصَلَّى، فَمَرَّ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ: "يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ". فَقُلْنَ: وَبِمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: "تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ، مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَذْهَبَ لِلُبِّ الرَّجُلِ الْحَازِمِ مِنْ إِحْدَاكُنَّ". قُلْنَ: وَمَا نُقْصَانُ عَقْلِنَا وَدِينِنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: "أَلَيْسَ شَهَادَةُ الْمَرْأَةِ مِثْلَ نِصْفِ شَهَادَةِ الرَّجُلِ؟" قُلْنَ: بَلَى. قَالَ: "فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ عَقْلِهَا، أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ؟" قُلْنَ: بَلَى. قَالَ: "فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ دِينِهَا".

অনুবাদ: ... রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: "তোমাদের (মাসিকের সময়) নামাজ পড়তে ও রোজা রাখতে হয় না কি?" তারা বললেন: হ্যাঁ। তিনি বললেন: "সেটাই হল তোমাদের দীনের দিক থেকে কমতি।"

· মর্ম: মাসিককালে নামাজ বাদ যায় এবং রোজা রাখা নিষেধ। রোজা পরে কাজা করতে হবে, কিন্তু নামাজের কাজা নেই।

খ) মাসিক শেষে পবিত্রতা (গোসল):

সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩১৪, সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩২:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ أَبِي حُبَيْشٍ كَانَتْ تُسْتَحَاضُ، فَسَأَلَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ: "إِنَّمَا ذَلِكِ عِرْقٌ، وَلَيْسَ بِالْحَيْضَةِ، فَإِذَا أَقْبَلَتْ حَيْضَتُكِ فَدَعِي الصَّلَاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي".

অনুবাদ: ... রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: "যখন তোমার মাসিক আসে তখন নামাজ ছেড়ে দিও, আর যখন তা শেষ হয় তখন রক্ত ধুয়ে ফেলে গোসল করে নামাজ পড়।"

· মর্ম: মাসিক শেষে ফরজ গোসল (اغتسال) 

গ) মাসিক অবস্থায় কোরআন স্পর্শ বা পড়া:

সুনান আদ-দারিমী, হাদিস নং ১৭৩২ (সনদ সহীহ):

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ: "لَا تَقْرَأِ الْحَائِضُ وَلَا الْجُنُبُ شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ".

অনুবাদ: "রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: মাসিকরত নারী এবং জুনুবী ব্যক্তি কোরআনের কিছুই পড়বে না।"

· ব্যাখ্যা: অধিকাংশ আলেম বলেন, স্পর্শ করা বা পড়া উভয়ই নিষেধ (শাফেয়ি, হানবালি মাযহাব)। কিছু আলেম দিল থেকে পড়া জায়েজ বলেন (যদি স্পর্শ না করে)।

ঘ) স্বামী-স্ত্রীর অন্যান্য সম্পর্ক:

সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৯৪, সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৬:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَأْمُرُنِي فَأَتَّزِرُ، فَيُبَاشِرُنِي وَأَنَا حَائِضٌ.

অনুবাদ: "আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে কোমরে কাপড় পরতে বলতেন, অতঃপর মাসিক অবস্থায়ও তিনি আমার সাথে শরীরের উপরিভাগ থেকে মিলাতেন (আলিঙ্গন করতেন)।"

· মর্ম: সহবাস ব্যতীত অন্যান্য আদর-স্নেহ, চুম্বন, আলিঙ্গন জায়েজ (শরীরের উপরিভাগ থেকে)।

ঙ) মাসিক অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ:

সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৮:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: "إِنِّي لَا أُحِلُّ الْمَسْجِدَ لِحَائِضٍ وَلَا جُنُبٍ".

অনুবাদ: "রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আমি মাসিকরত নারী ও জুনুবী ব্যক্তির জন্য মসজিদ হালাল করি না।"

· ব্যাখ্যা: প্রবেশ নিষেধ (যদি নামাজ বা দীর্ঘ অবস্থানের উদ্দেশ্য হয়)। তবে প্রয়োজনে (পথ অতিক্রম, শিক্ষা) দ্রুত যাওয়া-আসা নিয়ে কিছু আলেম ছাড় দিয়েছেন, তবে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

৩. মাসিক শেষে গোসলের পদ্ধতি (হাদিস অনুযায়ী):

সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩১৭:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ أَسْمَاءَ بِنْتَ شَكْلٍ سَأَلَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَنْ غُسْلِ الْمَحِيضِ، فَقَالَ: "تَأْخُذُ إِحْدَاكُنَّ مَاءَهَا وَسِدْرَتَهَا فَتَطَهَّرُ فَتُحْسِنُ الطُّهُورَ، ثُمَّ تَصُبُّ عَلَى رَأْسِهَا فَتَدْلُكُهُ دَلْكًا شَدِيدًا حَتَّى تَبْلُغَ شُؤُونَ رَأْسِهَا، ثُمَّ تَصُبُّ عَلَيْهَا الْمَاءَ، ثُمَّ تَأْخُذُ فِرْصَةً مُمَسَّكَةً فَتَطَهَّرُ بِهَا". فَقَالَتْ أَسْمَاءُ: كَيْفَ أَتَطَهَّرُ بِهَا؟ فَقَالَ: "سُبْحَانَ اللَّهِ! تَطَهَّرِي بِهَا". فَقَالَتْ عَائِشَةُ: تَتَبَّعِي بِهَا أَثَرَ الدَّمِ.

অনুবাদ: ... রাসূল (ﷺ) বললেন: "তোমরা পানি ও বরইয়ের পাতা নিয়ে ভালোভাবে পবিত্র হবে, তারপর মাথায় পানি ঢেলে ভালোভাবে মাথা ঘষবে যাতে পানি চুলের গোড়ায় পৌঁছায়, এরপর সমস্ত শরীরে পানি ঢালবে, এরপর সুগন্ধিযুক্ত কাপড় দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে।"

· গোসলের মূল শর্ত: সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো, বিশেষত চুলের গোড়ায়।

৪. মাসিক অবস্থায় তালাক দেওয়া নিষেধ:

সূরা আত-তালাক, আয়াত ১ (এবং হাদিস):

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ

অনুবাদ: "হে নবী, যখন তোমরা নারীদের তালাক দাও, তখন তাদের ইদ্দতের সময়ে তালাক দিও।"

· হাদিস (সহীহ বুখারী, ৫২৫১): রাসূল (ﷺ) ইবনে উমর (রা.)-কে তার স্ত্রীকে মাসিক অবস্থায় তালাক দেওয়ার কারণে ফিরিয়ে নিতে বলেছিলেন।

৫. মাসিককালীন বিশেষ অবস্থা (ইস্তিহাদা):

সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৩২৬:

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফাতিমা বিনতে আবি হুবাইশ (রা.)-কে বললেন: "যখন আসল মাসিকের রক্ত হয়, তখন তা কালো রঙের হয় এবং চেনা যায়। যখন তা এমন হয়, তখন নামাজ বন্ধ রাখ। আর যখন অন্য রকম হয়, তখন গোসল করে নামাজ পড়, কারণ তা শিরার রক্ত (ইস্তিহাদা)।"

· মর্ম: স্বাভাবিক মাসিক ও অস্বাভাবিক রক্তপাত (রোগ) এর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।

সারসংক্ষেপ (কোরআন-হাদিসের আলোকে):

বিষয় করণীয় বর্জনীয় (হারাম/নিষেধ)

নামাজ নামাজ পড়া বন্ধ রাখা, পরে কাজা নেই মাসিকে নামাজ পড়া

রোজা রোজা বন্ধ রাখা, পরে কাজা করতে হবে মাসিকে রোজা রাখা

কোরআন অনুবাদ পড়া, তাফসির পড়া (যদি স্পর্শ না করে) কোরআন স্পর্শ করা বা পড়া (বিতর্কিত, তবে সতর্কতা উত্তম)

সহবাস সম্পূর্ণ নিষেধ (কোরআন ২:২২২) যৌন মিলন

অন্যান্য সম্পর্ক চুম্বন, আলিঙ্গন, আদর (শরীরের উপরিভাগ থেকে) জায়েজ (হাদিস অনুযায়ী) যৌনাঙ্গের সংস্পর্শ

মসজিদে প্রবেশ অতি প্রয়োজন না হলে না যাওয়া, দ্রুত কাজ সেরে আসা নামাজ পড়া বা দীর্ঘ সময় অবস্থান

তালাক মাসিক শেষে পবিত্র অবস্থায় দেওয়া মাসিক অবস্থায় দেওয়া (নিষেধ)

গোসল মাসিক শেষে ফরজ গোসল (সম্পূর্ণ শরীর) গোসল না করে নামাজ/রোজা শুরু করা

মূলনীতি:

১.মাসিক একটি প্রাকৃতিক অবস্থা, এতে গুনাহ বা অসম্মান নেই।

২.এই সময় শারীরিক ও মানসিক যত্ন নে

ওয়া সুন্নত।

৩.সন্দেহ হলে বা জটিলতা দেখা দিলে কোনো আলেম/আলিমা বা ইসলামিক স্কলারের শরয়ী পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)
banner