প্রকৃত নামাযী কারা তা নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ এর কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে, কিছু গুণাবলী রয়েছে যা একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত নামাযী হিসেবে বিবেচনা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ:

0

       

                                                                     প্রকৃত নামাযী কারা

প্রকৃত নামাযী কারা তা নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ এর কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে, কিছু গুণাবলী রয়েছে যা একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত নামাযী হিসেবে বিবেচনা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ:


**১) নিয়মিত ও মনোযোগ সহকারে নামায আদায়:**

* প্রকৃত নামাযীরা ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামায নিয়মিত আদায় করেন। 

* তারা নামাযের সময় মনোযোগী থাকেন এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের সাথে নামায আদায় করেন।

* নামাযের পূর্বে ও পরে তারা যথাযথভাবে ওযু এবং দোয়া করেন।


**২) নামাযের বাইরেও ধার্মিক জীবনযাপন:**

* প্রকৃত নামাযীরা কেবল নামাযের সময়ই ধার্মিক নয়, বরং তাদের 

জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের নীতিমালা মেনে চলেন।

* তারা সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দানশীল এবং অন্যদের প্রতি সহায়ক হন।

* তারা মিথ্যা, গীবত, লাঞ্ছনা, পরনিন্দা, সুদ, জুয়া, মাদকদ্রব্য এবং অন্যান্য অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকেন।


**৩) নামাযের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি:**

* প্রকৃত নামাযীরা কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে না, বরং নামাযের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করে।

* তারা নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেন এবং তাদের নামায তাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।


**৪) নামাযের মাধ্যমে আত্মিক পরিশোধন:**

* প্রকৃত নামাযীরা নামাযকে আত্মিক পরিশোধনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।

* তারা নামাযের মাধ্যমে তাদের খারাপ অভ্যাসগুলি ত্যাগ করার এবং তাদের নৈতিকতা উন্নত করার চেষ্টা করেন।


**৫) অন্যদের নামাযের প্রতি উৎসাহিত করা:**

* প্রকৃত নামাযীরা কেবল নিজেরাই নামায আদায় করে না, বরং অন্যদেরও নামাযের প্রতি উৎসাহিত করে।

* তারা তাদের পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সমাজের অন্যদের নামাযের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেয়।


উল্লেখ্য যে, এই গুণাবলীগুলি ছাড়াও আরও অনেক গুণাবলী থাকতে পারে যা একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত নামাযী হিসেবে বিবেচনা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 


**সর্বোপরি, প্রকৃত নামাযী হলো সেই ব্যক্তি যার নামায কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার নামায তার জীবনের সকল 

ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।**


প্রকৃত নামাযীরা তাদের নামাযকে হেফাযত করে থাকে 

প্রকৃত নামাযীদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা তাদের নামাযের ব্যাপারে খুবই যত্নবান হয়। নামাযের হুকুম-আহকাম- ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি যথাযথভাবে পালন করে। মোটকথা রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে নামায আদায় করতেন, তারা ঠিক সেভাবেই নামায আদায় করার চেষ্টা করে। নামাযের সময় তারা দুনিয়ার চিন্তা মাথায় রাখে না। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতী লোকদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,


﴿وَالَّذِيْنَ هُمْ عَلٰى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ﴾

আর যারা তাদের নামাযসমূহের হেফাযত করে। (সূরা মু’মিনূন- ৯)


তারা নিয়মিত নামায আদায় করে থাকে :

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হচ্ছে, যা নিয়মিত করা হয়। এ কারণে প্রকৃত নামাযীদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা নিয়মিত জামাআতের সাথে নামায আদায় করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

﴿اَلَّذِيْنَ هُمْ عَلٰى صَلَاتِهِمْ دَآئِمُوْنَ﴾

আর যারা নিয়মিত নামায আদায় করে। (সূরা মাআরিজ- ২৩)


হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا اَنَّهَا قَالَتْ سُئِلَ النَّبِيُّ اَيُّ الْاَعْمَالِ اَحَبُّ اِلَى اللهِ قَالَ اَدْوَمُهَا وَاِنْ قَلَّ وَقَالَ اكْلَفُوْا مِنَ الْاَعْمَالِ مَا تُطِيْقُوْنَ

আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করা হলো, কোন্ কাজ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়? তিনি বললেন, যে কাজ সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত করা হয়- যদিও তা (পরিমাণে) কম হয়। তিনি আরো বললেন, তোমার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ নিজের উপর টেনে নিয়ো না। [সহীহ বুখারী, হা/৬৪৬৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৮৬৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৩৫৬।]


অতএব নামায শুধু পড়লেই হবে না, বরং প্রকৃত নামাযী হতে হলে নামাযের ব্যাপারে যথাযথভাবে মনোযোগী হতে হবে এবং তা নিয়মিতভাবে আদায় করতে হবে

বেনামাযীর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণ


বেনামাযীর সংখ্যা এত বেশি হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। যেমন-

১. বেনামাযীর সংজ্ঞা-ই অনেকে জানে না।

২. অনেক মানুষ নামাযের গুরুত্ব ও মর্যাদা বুঝে না।

৩. নামায আদায় করার লাভ ও উপকারিতা যেভাবে উল্লেখ করা হয় তার বিপরীতে বেনামাযীর মারাত্মক ক্ষতি ও ধ্বংসাত্মক পরিণতির কথা তেমনভাবে উল্লেখ করা হয় না। অথচ উপকার অর্জনের চেয়ে অপকার ও ক্ষতি দমনে মানুষ বেশি তৎপর হয়ে থাকে।


৪. নামায পরিত্যাগকারীর কিছু পরকালীন ক্ষতি ও পরিণতি উল্লেখ করা হলেও ইহকালীন তথা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কী কী ক্ষতি ও পরিণতির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা উল্লেখ করা হয় না।


৫. হাদীসের পরিপন্থী কিছু নিয়ম-কানুন ঢুকিয়ে নামাযকে কঠিন করা হয়েছে। যেমন- ওযুতে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করার সময় নির্দিষ্ট দু‘আ পড়া, বিভিন্ন নামাযের নিয়ত পড়া ইত্যাদি। এ ধরনের নিয়তগুলো অনেকেরই মুখস্থ নেই বিধায় তারা নামায পড়ে না।


৬. অনেকের নামায আদায়ের ইচ্ছা থাকলেও নিয়ম-কানুন ও সূরা কিরাআত না জানার কারণে তারা নামায আদায় করে না।


৭. নামায ত্যাগ করার যে শাসিত্ম ও পরিণতির কথা এসেছে তা কেবল ফরয নামাযের ব্যাপারেই। কিন্তু আমাদের সমাজের অনেকে ফরয ও সুন্নাতের শব্দগত পার্থক্য করে থাকলেও আমলের ক্ষেত্রে উভয় প্রকার নামাযকে সমানভাবে গুরুত্বারোপ করে উপস্থাপন করে থাকেন। ফলে একজন ব্যক্তি মনে করে যে, সে যত ব্যসত্মই হোক না কেন এবং যত চাপের মধ্যেই থাকুক না কেন, যুহরের নামাযের জন্য মসজিদে ঢুকলে ফরযের পূর্বে ৪ রাকআত, ফরয ৪ রাকআত, ফরযের পর ২ রাকআত- এই মোট ১০ রাকআত নামায না পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। তাই সময় না থাকায় বা এতগুলো রাকআতের ঝামেলায় সে নামাযই আদায় করে না। অথচ শুধু ফরয ৪ রাকআত পড়ে বের হয়ে গেলেই সে নামায পরিত্যাগের শাসিত্ম ও ক্ষতি থেকে মুক্ত হতে পারত।


৮. সূরা আনকাবূত এর ৪৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘‘আর নামায কায়েম করো, নিশ্চয় নামায গর্হিত ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।’’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়ে থাকে, যে ব্যক্তি নামায পড়েও অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে না তার নামায হয় না। ফলে যারা বিভিন্ন গুনাহের কাজে জড়িত রয়েছে তারা নিরুৎসাহিত হয়ে নামায আদায় করে না। অথচ নামায আদায়কারী ব্যক্তির দ্বারাও গুনাহ হতে পারে। যার কিছু গুনাহ নামাযের মাধ্যমেই মাফ হয়ে যায়।


৯. অনেকেই বালেগ হওয়ার পর বহু বছর নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যখন তাদের ভুল বুঝতে পেরে নিয়মিত নামায পড়ার নিয়ত করে, তখন এক শ্রেণির আলেম তাদেরকে উমরী ক্বাযা তথা বালেগ হওয়ার পর থেকে ছুটে যাওয়া নামাযের কাযা আদায় করার ফতওয়া দেন। ফলে ঐ ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা হতে নিরাশ হয়ে যায়। অথচ কাযা হলো গ্রহণযোগ্য কারণবশত হঠাৎ ১/২ ওয়াক্ত ছুটে গেলে সেটা তৎক্ষণাৎ পড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি কোনদিন নামাযই আদায় করেনি অথবা কোন ওয়াক্ত পড়েছে ও কোন ওয়াক্ত বাদ দিয়েছে তার কোন হিসাব নেই, ঐ ব্যক্তি তাওবা করে নিয়মিতভাবে সেদিন থেকে পূর্ণ পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করলেই যথেষ্ট হবে।


মূলত এসব কারণেই আমাদের সমাজে বেনামাযীর সংখ্যা এত বেশি


বেনামাযী ফাসিক নাকি কাফির


আলেমগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়াকে অস্বীকার করবে, নিঃসন্দেহে সে কাফির হয়ে যাবে।


আর যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়াকে স্বীকার করা সত্ত্বেও অলসতাবশত অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করবে সে কাফির হিসেবে গণ্য হবে নাকি ফাসিক হিসেবে গণ্য হবে- এ ব্যাপারে আলেমগণের দুটি অভিমত রয়েছে। যেমন-


প্রথম অভিমত- নামায পরিত্যাগকারী ফাসিক :

দ্বিতীয় অভিমত- নামায পরিত্যাগকারী কাফির 


বেনামাযী ফাসিক হওয়ার দলীল


যারা মনে করেন যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হওয়ার কথা স্বীকার করা সত্ত্বেও নিজেদের অলসতা অথবা অবহেলার কারণে যারা নামায পরিত্যাগ করে থাকে, তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে না, তাদের দলীল হচ্ছে-


দলীল নং- ১

﴿اِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ اَنْ يُّشْرَكَ بِهٖ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِكَ لِمَن يَّشَآءُ﴾

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক স্থাপন করার অপরাধ ক্ষমা করবেন না। এটা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন।

(সূরা নিসা- ৪৮)


অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা কেবল শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর নামায পরিত্যাগ করা শিরক নয়। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন।


দলীল নং- ২

অনেক প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে যে, যে ব্যক্তি ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ এর সাক্ষ্য দেবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। যেমন-


حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيَّ  وَمُعاذٌ رَدِيْفُهٗ عَلَى الرَّحْلِ قَالَ يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ قَالَ لَبَّيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ قَالَ يَا مُعَاذُ قَالَ لَبَّيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ ثَلَاثًا قَالَ مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ صِدْقًا مِنْ قَلْبِه إِلَّا حَرَّمَهُ اللهُ عَلَى النَّارِ قَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَفَلَا أُخْبِرُ بِهِ النَّاسَ فَيَسْتَبْشِرُوْا قَالَ إِذًا يَتَّكِلُوْا وَأَخْبَرَ بِهَا مُعَاذٌ عِنْدَ مَوْتِه تَأَثُّمًا

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা নবী ﷺ উটের উপর সওয়ারীতে ছিলেন এবং মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) তাঁর পিছনে বসা ছিলেন। তিনি বললেন, হে মুয়ায ইবনে জাবাল! মুয়ায (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত এবং আপনার আনুগত্যের জন্য প্রস্তুত। তারপরও রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে মুয়ায! মুয়ায (রাঃ)-ও অনুরূপ উত্তর দিলেন। তিনি তিন বার এভাবে তাকে সম্বোধন করেন। মুয়ায (রাঃ)-ও প্রত্যেক বার একই উত্তর দেন। তারপর তিনি বললেন, কোন বান্দা যদি আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেয় যে, ‘‘আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল’’, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। মুয়ায (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি লোকদেরকে এ কথা বলে দেব? যাতে তারা শুভ সংবাদ পেতে পারে। তিনি বললেন, যদি তুমি তাদেরকে এ কথা বলে দাও, তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করবে (অর্থাৎ আমল ছেড়ে দেবে)। অতঃপর মুয়ায (রাঃ) ইন্তিকালের সময় হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, যাতে ইলম গোপন রাখার গুনাহ না হয়। [সহীহ বুখারী, হা/১২৮; সহীহ মুসলিম, হা/৩২; শু‘আবুল ঈমান, হা/১২৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৫২২; মিশকাত, হা/২৫।]


عن عِتْبَانَ بْنَ مَالِكٍ....... قَالَ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ  فَإِنَّ اللهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ يَبْتَغِىْ بِذٰلِكَ وَجْهَ اللهِ

ইতবান ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ বলবে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন। [সহীহ বুখারী, হা/৪২৬; সহীহ মুসলিম, হা/৩৩; বায়হাকী, হা/২০৮৯৩।]


তারা বলে থাকেন যে, উপরোক্ত হাদীসসমূহে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করা এবং জান্নাতে প্রবেশের জন্য নামাযকে শর্তারোপ করা হয়নি। বরং কেবল ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-কে শর্তারোপ করা হয়েছে। সুতরাং যারা কেবল এর সাক্ষ্য দিবে তাদেরকে কাফির বলা যাবে না।


তবে এরূপ হাদীসগুলোর মধ্যে রয়েছে-

يَبْتَغِىْ بِذٰلِكَ وَجْهَ اللهِ

তথা ‘‘এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবে’’

অথবা صِدْقًا مِنْ قَلْبِه

তথা ‘‘অন্তরে ঈমানের সত্যতা নিয়ে’’ ইত্যাদি।


সুতরাং সাক্ষ্যদ্বয়কে নিয়তের একনিষ্ঠতা ও অন্তরের সত্যতার সাথে শর্তযুক্ত করা হয়েছে, যা নামায ত্যাগের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হয়। কেননা নিয়তের একনিষ্ঠতা ও অন্তরের সততা আবশ্যকীয়ভাবে নামায আদায়ের উপর নির্ভর করে।


বেনামাযী কাফির হওয়ার দলীল


যারা মনে করেন যে, নামায পরিত্যাগকারী কাফির হয়ে যায় তাদের দলীল হচ্ছে-


দলীল নং- ১

অনেক হাদীসে ইসলাম ও কুফরের মাঝে নামাযকে পার্থক্যকারী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন-


عَنْ جَابِرٍ  قَالَ سَمِعْتُ النَّبِىَّ- يَقُوْلُ اِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, ব্যক্তি এবং শিরক ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্যের মাপকাঠি হলো নামায আদায় না করা। [সহীহ মুসলিম, হা/২৫৬; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৬৭৩০; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৫৬৩।]


عَنْ بُرَيْدَةَ  قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  اَلْعَهْدُ الَّذِيْ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ

বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমাদের ও তাদের মধ্যে যে অঙ্গীকার রয়েছে তা হলো নামায। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করল, সে কুফরী করল। [তিরমিযী, হা/২৬২১; নাসাঈ, হা/৪৬৩; ইবনে মাজাহ, হা/১০৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৮৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৪৫৪; দার কুতনী, হা/১৭৫১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১১; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৫৬৪; মিশকাত, হা/৫৭৪।]


এ হাদীসগুলোর স্পষ্ট ভাষ্য হচ্ছে, মুসলিম ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যকারী জিনিস হচ্ছে নামায। আবু হাতীম (রাঃ) বলেন, নবী ﷺ নামায ত্যাগকারীর উপর কুফর শব্দ প্রয়োগ করেছেন। কেননা নামায ত্যাগ করা কুফরীর প্রথম ধাপ। যখন ব্যক্তি নামায ত্যাগ করে এবং নামায ত্যাগ করাকে অভ্যাসে পরিণত করে নেয় তখন সে অন্যান্য ফরয ইবাদাতও ত্যাগ করে। আর যখন সে নামায ত্যাগে অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন কার্যত সে নামায অস্বীকারকারী হয়ে যায়। এজন্য নবী ﷺ নামায ত্যাগকারীর শেষ পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করেই তার উপর কুফর শব্দ প্রয়োগ করেছেন। [সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৪৬৩।]


দলীল নং- ২

عَنْ بُرَيْدَةَ  عَنِ النَّبِيِّ قَالَ بَكِّرُوْا بِالصَّلَاةِ فِيْ يَوْمِ الْغَيْمِ فَاِنَّهٗ مَنْ تَرَكَ الصَّلَاةَ فَقَدْ كَفَرَ

বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, তোমরা বৃষ্টির দিনে নামাযে তৎপর থাকো। কেননা যে ব্যক্তি এক ওয়াক্ত নামায ত্যাগ করল সে কুফরী করল। [ইবনে হিববান, হা/১৪৬৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৫৬৮।]


দলীল নং- ৩


﴿فَاِنْ تَابُوْا وَاَقَامُوا الصَّلَاةَ وَاٰتَوُا الزَّكَاةَ فَاِخْوَانُكُمْ فِى الدِّيْنِ﴾

অতঃপর তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। (সূরা তাওবা- ১১)


অত্র আয়াতে মুসলিম ও মুশরিকদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার জন্য তিনটি শর্তারোপ করা হয়েছে। তা হলো-


১. তারা শিরক থেকে তওবা করবে।

২. নামায কায়েম করবে।

৩. যাকাত প্রদান করবে।


যদি উল্লেখিত শর্তসমূহের কোন একটি না থাকে, তাহলে ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে না। আর ফাসেকী কাজ ও ছোট-খাটো কুফরী কর্ম দ্বারা ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট হয় না। বরং তা এমন কুফরী দ্বারা বিনষ্ট হয়, যা দ্বীন থেকে বের করে দেয়।


দলীল নং- ৪

﴿فَخَلَفَ مِنْ ۢبَعْدِهِمْ خَلْفٌ اَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا ‐ إِلَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُوْنَ شَيْئًا﴾

তাদের পরে এমন লোকদের আবির্ভাব হয়েছে, যারা নামাযকে নষ্ট করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। অচিরেই তারা জাহান্নামের ‘গাই’ নামক গর্তে প্রবেশ করবে। কিন্তু যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। (সূরা মারইয়াম- ৫৯, ৬০)


অত্র আয়াতে বর্ণিত إِلَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ তথা ‘‘কিন্তু যে তওবা করেছে এবং ঈমান এনেছে’’ অংশ দ্বারা প্রমাণ করে যে, যখন তারা নামায বরবাদ করেছে (ত্যাগ করেছে) ও নিজের মন প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে তখন তারা মুমিন ছিল না।


দলীল নং- ৫

﴿مَا سَلَكَكُمْ فِيْ سَقَرَ ‐ قَالُوْا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّيْنَ ‐ وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِيْنَ ‐ وَكُنَّا نَخُوْضُ مَعَ الْخَآئِضِيْنَ ‐ وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّيْنِ ‐ حَتّٰۤى اَتَانَا الْيَقِيْنُ﴾

কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাল? তারা বলবে আমরা নামায আদায়কারী ছিলাম না এবং অভাবীদেরকে খাদ্য দিতাম না। বরং আমরা অনর্থক আলাপকারীদের সাথে মগ্ন থাকতাম। আর আমরা প্রতিদান দিবসকে অস্বীকার করতাম। অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে। (সূরা মুদ্দাসসির, ৪২-৪৭)


অত্র আয়াত অনুযায়ী বুঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন নামায পরিত্যাগকারীকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে এবং তাকে সাকার নামক জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। নামায পরিত্যাগকারীকে কাফির হিসেবে সাব্যস্ত করার জন্য এটি সুস্পষ্ট দলীল।


দলীল নং- ৬

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  مَنْ صَلّٰى صَلَاتَنَا وَاسْتَقْبَلَ قِبْلَتَنَا وَأَكَلَ ذَبِيْحَتَنَا فَذٰلِكَ الْمُسْلِمُ الَّذِيْ لَهٗ ذِمَّةُ اللهِ وَذِمَّةُ رَسُوْلِه فَلَا تُخْفِرُوا اللهَ فِيْ ذِمَّتِه

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের মতো নামায পড়বে, আমাদের কিবলার দিকে মুখ ফিরাবে এবং আমাদের যবেহকৃত পশুর গোশ্ত খাবে সে এমন এক মুসলিম, যার জন্য আছে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল এর নিরাপত্তা। সুতরাং আল্লাহর তত্ত্বাবধানে কেউ খিয়ানত করো না। [সহীহ বুখারী, হা/৩৯১; বায়হাকী, হা/২২৮৭; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৫৬৫; মিশকাত, হা/১৩।]


দলীল নং- ৭

عَنْ مُعَاذٍ قَالَ أَوْصَانِيْ رَسُوْلُ اللهِ  ..... وَلَا تَتْرُكَنَّ صَلَاةً مَكْتُوْبَةً مُتَعَمِّدًا فَإِنَّ مَنْ تَرَكَ صَلَاةً مَكْتُوْبَةً مُتَعَمِّدًا فَقَدْ بَرِئَتْ مِنْهُ ذِمَّةُ اللهِ

মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে অসিয়ত করেছেন যে, তুমি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে ফরয নামায পরিত্যাগ করবে না। কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ফরয নামায পরিত্যাগ করে তার উপর আল্লাহর যিম্মাদারিত্ব উঠে যায়। [মুসনাদে আহমাদ, হা/২২০৭৫; বায়হাকী, হা/১৫১৭৪; মিশকাত, হা/৬১; হাদীসটি যঈফ।]


কোন ব্যক্তি যদি নামায পরিত্যাগ করার পরও ইসলামের উপর অটল থাকত, তাহলে সে ইসলামের যিম্মায় থাকত।


দলীল নং- ৮

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ  قَالَ سَتَكُوْنُ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُوْنَ وَتُنْكِرُوْنَ فَمَنْ عَرَفَ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ سَلِمَ وَلٰكِنْ مَنْ رَضِىَ وَتَابَعَ قَالُوْا أَفَلَا نُقَاتِلُهُمْ قَالَ لَا مَا صَلَّوْا

উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অতিসত্তর তোমাদের উপর এমন শাসক নিযুক্ত করা হবে, যাদের কিছু কাজ তোমরা পছন্দ করবে এবং কিছু কাজ অপছন্দ করবে। যে ব্যক্তি তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে সে দায়মুক্ত হবে এবং যে তাদের কাজকে ঘৃণা করবে সেও দায়মুক্ত হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে ও তাদের অনুসরণ করবে (সে অন্যায়ের অংশীদার হবে)। তখন সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি এমতাবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, না- যে পর্যন্ত তারা নামায আদায় করবে। [সহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৪; তিরমিযী, হা/২২৬৫; আবু দাউদ, হা/৪৭৬০।]


দলীল নং- ৯

عَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ  عَنْ رَسُوْلِ اللهِ  قَالَ خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِيْنَ تُحِبُّوْنَهُمْ وَيُحِبُّوْنَكُمْ وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّوْنَ عَلَيْهِمْ وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِيْنَ تُبْغِضُوْنَهُمْ وَيُبْغِضُوْنَكُمْ وَتَلْعَنُوْنَهُمْ وَيَلْعَنُوْنَكُمْ قِيْلَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَفَلَا نُنَابِذُهُمْ بِالسَّيْفِ فَقَالَ لَا مَا أَقَامُوْا فِيْكُمُ الصَّلَاةَ

আউফ ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা তারাই যারা তোমাদেরকে ভালোবাসে, আর তোমরাও তাদেরকে ভালোবাস; তারা তোমাদের জন্য দু‘আ করে, আর তোমরাও তাদের জন্য দু‘আ কর। আর তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট নেতা তারাই যারা তোমাদেরকে ঘৃণা করে, আর তোমরাও তাদেরকে ঘৃণা কর; তোমাদের প্রতি তারা অভিসম্পাত করে, আর তোমরাও তাদের প্রতি অভিসম্পাত কর। রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাদের সাথে যুদ্ধ করব না? তিনি উত্তরে বললেন- না! যতদিন পর্যন্ত তারা নামায প্রতিষ্ঠা করে ততদিন পর্যন্ত নয়। [সহীহ মুসলিম, হা/৪৯১০; তিরমিযী, হা/২২৬৪; বায়হাকী, হা/১৭০৬৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪০২৭; মিশকাত, হা/২৬৭০।]


দলীল নং- ১০

কতিপয় সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অধিকাংশ সাহাবীই নামায পরিত্যাগকারীকে কাফির মনে করতেন। যেমন-


عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ شَقِيْقٍ الْعُقَيْلِيِّ قَالَ كَانَ أصْحَابُ مُحَمَّدٍ  لَايَرَوْنَ شَيْئًا مِنَ الْأعْمَالِ تَرْكُهٗ كُفْرٌ غَيْرَ الصَّلَاةِ

আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক আল-উকাইলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ ﷺ এর সাহাবীগণ নামায ছেড়ে দেয়া ব্যতীত অন্য কোন আমল ছেড়ে দেয়াকে কুফরী মনে করতেন না। [তিরমিযী, হা/২৬২২; মুসনাদুল জামে‘, হা/১৫৫২৩; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৫৬৫; মিশকাত, হা/৫৭৯।]


عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ مَنْ لَمْ يُصَلِّ فَلَا دِيْنَ لَهٗ

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি নামায আদায় করে না, তার দ্বীন বলতে কিছুই নেই। [বায়হাকী, হা/৬৭৩৪; শু‘আবুল ঈমান, হা/৪৩।]

প্রখ্যাত ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াই (রহ.) বলেন, নবী ﷺ হতে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত রয়েছে যে, নামায ত্যাগকারী কাফির। আর নবী ﷺ এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত আলেমগণের এটাই মত যে, কোন ব্যক্তি যদি ওজর ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ত্যাগ করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। ইমাম ইবনে হাযম উল্লেখ করেন, নিশ্চয় উমর ইবনে খাত্তাব, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মুয়ায ইবনে জাবাল, আবু হুরায়রা (রাঃ) সহ অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম এটার উপরই মত দিয়েছেন। অতঃপর তিনি আরো উল্লেখ করেন, আমি জানি না যে, সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন কি না। [মির‘আতুল মাফাতীহ, ৪/১৭০ পৃঃ; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৫৭৫।]

দলীল নং- ১১

عَنْ بُرَيْدَةَ  قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  اَلْعَهْدُ الَّذِيْ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ

বুরাইদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমাদের ও তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে যে অঙ্গীকার রয়েছে তা হলো নামায। সুতরাং যে নামায ত্যাগ করল, সে কুফরী করল। [তিরমিযী, হা/২৬২১; নাসাঈ, হা/৪৬৩; ইবনে মাজাহ, হা/১০৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৮৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৪৫৪; দার কুতনী, হা/১৭৫১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১১; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৫৬৪; মিশকাত, হা/৫৭৪।]


দলীল নং- ১২

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَلَا صَدَّقَ وَلَا صَلّٰى‐ - وَلٰكِنْ كَذَّبَ وَتَوَلّٰى﴾

অতঃপর সে (জাহান্নামী) লোকটি বিশ্বাস করেনি এবং নামাযও আদায় করেনি; বরং সে অস্বীকার করেছে এবং মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। (সূরা ক্বিয়ামাহ- ৩১, ৩২)


অত্র আয়াতের ভাষ্যটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর তার প্রাথমিক জরুরি কাজ হলো- নামায আদায় করা। আর নামাযের মাধ্যমেই যাচাই হয়ে যায় যে, ব্যক্তির ঈমান আনাটা সত্য কি না? যদি সে নামায আদায় করে তাহলে বুঝা যাবে যে, সত্যিই সে ঈমান এনেছে। আর যদি নামায আদায় না করে তাহলে প্রমাণিত হবে যে, সে কেবল মুখে কালিমা পড়েছে, মনে-প্রাণে পড়েনি এবং পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করেনি। অতএব কোন ব্যক্তি যদি নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে এবং সে নামাযও পরিত্যাগ করে, তাহলে সে কাফির হিসেবেই গণ্য হবে।


দলীল নং- ১৩

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مُنِيْبِيْنَ اِلَيْهِ وَاتَّقُوْهُ وَاَقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُوْنُوْا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ﴾

তোমরা একনিষ্ঠভাবে তাঁর অভিমুখী হও এবং শুধু তাঁকেই ভয় করো। আর তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা করো এবং কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। (সূরা রূম- ৩১)


অত্র আয়াতে নামায পরিত্যাগকারীকে মুশরিক হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর মুশরিকরা কাফিরদেরই একটি প্রকার।

দলীল নং- ১৪

আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতে গিয়ে বলেন,

﴿فَاِنْ تَابُوْا وَاَقَامُوا الصَّلَاةَ وَاٰتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوْا سَبِيْلَهُمْ اِنَّ اللهَ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ﴾

যদি তারা তওবা করে, নামায আদায় করে এবং যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা- ৫)


এ আয়াতে নামায কায়েম এবং যাকাত আদায় করাকে নিরাপত্তার মানদন্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই যে ব্যক্তি নামায কায়েম করে না এবং যাকাত আদায় করে না, সে নিরাপত্তা পাবে না। আর যে ব্যক্তির উপর থেকে মুসলিমদের নিরাপত্তা উঠে যায়, সে কাফির হিসেবেই গণ্য হয়।


দলীল নং- ১৫


عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو عَنِ النَّبِيِّ اَنَّهٗ ذَكَرَ الصَّلَاةَ يَوْمًا فَقَالَ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا كَانَتْ لَهٗ نُوْرًا وَبُرْهَانًا وَنَجَاةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ لَمْ يُحَافِظْ عَلَيْهَا لَمْ يَكُنْ لَهٗ نُوْرٌ وَلَا بُرْهَانٌ وَلَا نَجَاةٌ وَكَانَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ قَارُوْنَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَاُبَيِّ بْنِ خَلَفٍ


আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন নবী ﷺ সালাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন, যে ব্যক্তি এটাকে হেফাযত করবে তা কিয়ামতের দিন তার জন্য জ্যোতি, মুক্তির দলীল ও নাজাতের অসীলা হবে। আর যে ব্যক্তি এটাকে হেফাযত করবে না তার জন্য কিয়ামতের দিন কোন জ্যোতি, মুক্তির দলীল এবং নাজাতের জন্য কোন অসীলা থাকবে না। আর সে কিয়ামতের দিন কারূন, ফিরাউন, হামান এবং উবাই ইবনে খালফের সাথে থাকবে। [মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৫৭৬, সহীহ ইবনে হিববান, হা/১৪৬৭; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৪৩১।]


উল্লেখিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, নামায ত্যাগকারীর হাশর হবে কারূন, ফিরাউন, হামান এবং উবাই ইবনে খালফ- এদের সাথে। আর এ কথা স্পষ্ট যে, এসব ব্যক্তি বড় বড় কাফির ছিল। এমনকি এরা কাফির মুশরিকদের নেতা ছিল। সুতরাং বেনামাযীরা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।


Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)
banner